ফিস্টুলা বা ভগন্দর কি এ রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা

ফিস্টুলা বা ভগন্দর হল পায়ুপথের সঙ্গে চামড়ার অস্বাভাবিক সংযোগ। সাধারণত মলদ্বারের পাশের গ্রন্থি বন্ধ এবং সংক্রমিত হয়ে বিষফোঁড়া হয় এবং অধিক...

ফিস্টুলা বা ভগন্দর হল পায়ুপথের সঙ্গে চামড়ার অস্বাভাবিক সংযোগ। সাধারণত মলদ্বারের পাশের গ্রন্থি বন্ধ এবং সংক্রমিত হয়ে বিষফোঁড়া হয় এবং অধিকহারে পুঁজ বের হওয়ার দরুন ফোঁড়া বৃদ্ধি পেয়ে মলদ্বারের ভেতর ও বাইরের মধ্যে অস্বাভাবিক একটি সংযোগ স্থাপন করে। এ অবস্থায় অনেক সময়ই বাইরের মুখ ক্ষণস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে পুঁজ বা কষ ঝরতে থাকে এবং তা কিছুটা ফুলে যায়। এতে রোগীর মলদ্বারে ব্যথা এবং হালকা জ্বর হতে পারে। মলদ্বারে বিষফোঁড়া হওয়া রোগীদের মধ্যে সাধারনত শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর ফিস্টুলা হয়। আবার অনেক সময় ফিস্টুলা এবং বিষফোঁড়া একই সঙ্গে প্রকাশ পেতে পারে। এছাড়া মলদ্বারের যক্ষা, বৃহদন্ত্রের প্রদাহ এবং মলদ্বারের ক্যান্সার থেকেও ফিস্টুলা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত এ রোগটি হয় না। মোটামুটিভাবে প্রতি এক লাখ লোকের মধ্যে আট থেকে নয় জন ফিস্টুলা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
সাধারনত মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এর নালীটি মলদ্বারের কোন স্তর ভেদ করেছে বা কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে, তার ওপর নির্ভর করে এর জটিলতার ধরন। বিভিন্ন ধরনের ফিস্টুলার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি ও কৌশল। এ রোগের একমাত্র চিকিৎসাই হল সার্জারি বা শৈল্য চিকিৎসা। সাধারনত ৫ থেকে ১০ শতাংশ ফিস্টুলা রোগীর আবার ফিস্টুলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ফিস্টুলার প্রকারভেদ
ফিস্টুলার নালিটির গতিপথের উপর ভিত্তি করে আমেরিকান গ্যাস্ট্রএন্টারোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ফিস্টুলাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেছে। যথা-
সরল ফিস্টুলা
সরল ফিস্টুলার মুখ মলদ্বারের অল্প ভেতরে থাকে এবং মলদ্বারের মাংসপেশি অল্প সম্পৃক্ত হয় বা একেবারেই হয় না।
জটিল ফিস্টুলা
জটিল ফিস্টুলার মুখ মলদ্বারের গভীরে থাকে এবং জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে মলদ্বারের মাংসপেশি বেশি পরিমাণে সম্পৃক্ত হয়। জটিল ফিস্টুলার শাখা প্রশাখা থাকে বা ফিস্টুলার সঙ্গে অন্যান্য অঙ্গ যেমন- মুত্রথলি, যোনিপথ ইত্যাদির সংযোগ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের ফিস্টুলায় বাইরের দিকে একাধিক মুখও থাকতে পারে। সাধারনত অপারেশনের পর পুনরায় ফিস্টুলা, মলদ্বারের যক্ষা, বৃহদন্ত্রের প্রদাহ এবং মলদ্বারের ক্যান্সারের কারনে ফিস্টুলা হলে, সেগুলো জটিল ফিস্টুলা হয়ে থাকে।
রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা
সাধারনভাবে চিকিৎসকরা রোগীর ইতিহাস শুনে ফিস্টুলার প্রকারভেদ সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর সমস্যা শুনে এবং মলদ্বার দেখে বা মলদ্বারে আঙুল দিয়ে পরীক্ষা করে ফিস্টুলা রোগটি সনাক্ত করা যায়। আঙুল দিয়ে পরীক্ষা করলে ভেতর ও বাইরের মুখ আঙুলে অনুভব করা যায় এবং অস্বাভাবিক সংযোগটি শক্ত রেখার মতো অনুভূত হয়। এছাড়াও চিকিৎসকের পরামর্শ মত আরও কিছু পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন-
  • ফিস্টুলোগ্রাম করে সংযোগটি সনাক্ত করা যায়।
  • এন্ডোরেকটাল আলট্রাসাউন্ড করে ফিস্টুলার প্রকারভেদ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
  • মলদ্বারের যক্ষা, বৃহদন্ত্রের প্রদাহ কিংবা মলদ্বারের ক্যান্সার থেকে ফিস্টুলা হয়েছে এমন সন্দেহ হলে চিকিৎসকরা কোলনোস্কপি করে থাকেন।
  • জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে এমআরআই করার প্রয়োজন হতে পারে।
  • আবার অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে বেরিয়াম এক্সরে বা মলদ্বারের ভেতরের আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা করতে পারেন।
চিকিৎসা
এ রোগে অপারেশন ভিন্ন অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। অপারেশনের মাধ্যমে অস্বাভাবিক সংযোগটি সম্পর্ণভাবে কেটে ফেলতে হয়। যদি কোনো অংশ থেকে যায় তবে তা থেকে আবার এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকি আরও বেশি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বর্তমানে এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রচলিত অপারেশন পদ্ধতিগুলো হল ফিস্টুলোটোমি, ফিস্টুলেকটোমি, সেটন, ফিস্টুলা প্লাগ, ফিস্টুলা গ্লু, ফ্ল্যাপ ব্যবহার, এন্ডোস্কোপিক ফিস্টুলা সার্জারি, রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার, স্টেম সেল ব্যবহার, লেজার ব্যবহার, মলদ্বারের মাংসপেশির মাঝখানের নালি বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রথম তিনটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়।

সাধারণত জটিল প্রকৃতির ফিস্টুলার চিকিৎসায় ফিস্টুলেকটমি ও সেটন ব্যবহার করা হয়। হাই ফিস্টুলার ক্ষেত্রে সম্পর্ণ ফিস্টুলার সংযোগ কেটে আনলে রোগীর এনাল স্ফিংটার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মল ঝরবে, তাই এরকম ক্ষেত্রে সেটন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতির ফলাফল খুবই সন্তোষজনক। আবার যেসব ক্ষেত্রে ফিস্টুলেকটমি ও সেটন ব্যবহার করা সম্ভব হয় না, সেসব ক্ষেত্রে এন্ডোরেকটাল এডভান্সমেন্ট ফ্লাপ ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা বর্তমানে অনেক জনপ্রিয় এবং নিরাপদ।
পদ্ধতি যেটাই হোক না কেনো এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে মূলত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ফিস্টুলা নালিটি বন্ধ করা এবং মল ধরে রাখার ক্ষমতা ইত্যাদি কয়েকটি বিষয়েই বেশি খেয়াল রাখা হয়। সাধারণত কোমরের নিচ থেকে অবশ করে অপারেশন করা হয়ে থাকে। ১ থেকে ২ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। ফিস্টুলা অপারেশনের ঘা শুকাতে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যায়। জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে সেটন পদ্ধতিতে দুই তিন ধাপে অপারেশন করা হতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে, প্রতিটি ধাপের মাঝে ৭ থেকে ১০ দিন বিরতি দিতে হয়। এই সময়ে নিয়মিত ড্রেসিং করতে হয়, এটা অপারেশন পরবর্তী পুনরায় এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অপারেশনকে ভয় পায়। তাই অপারেশনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধান হতে হবে যেন অসাধু চিকিৎসকের প্রতারনার শিকার হতে না হয়।
ফিস্টুলা রোগ কি চিকিৎসায় ভালো হয়?
এ রোগ হলে অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখেন। এতে ধীরে ধীরে তার জটিলতা যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি জীবনও বিষাদময় হয়ে উঠে। অথচ চিকিৎসার মাধ্যমে ফিস্টুলা রোগ সম্পূর্ণ ভালো হতে পারে।
এ রোগে সাধারনত নারীদের যোনিপথ বা মাসিকের রাস্তা দিয়ে যাদের অনবরত প্রশ্রাব ঝরতে থাকে। শতকরা প্রায় নব্বই ভাগ ফিস্টুলাই সন্তান প্রসবকালে পাওয়া নানান আঘাতের কারনে হয়ে থাকে। চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। বর্তমানে বৈদেশিক সাহায্যকারী সংস্থার সহযোগিতায় কিছু কেন্দ্রে বিনামূল্যে এ রোগের চিকিৎসা করা হচ্ছে অর্থাৎ এসকল কেন্দ্রে এর চিকিৎসায় কোনো অর্থই ব্যয় করতে হবে না।
ফিস্টুলা অপারেশনের পর আবার হতে পারে?
একথা সত্য যে এ রোগ অপারেশনের পর আবার হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে অপারেশনের পর ফিস্টুলা পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ যা জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে শতকরা ৪০ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে। ফিস্টুলা অপারেশনের পর পুনরায় হবেই এমনটা কিন্তু নয়। এটা মূলত নির্ভর করে ফিস্টুলার ধরন, সার্জনের অভিজ্ঞতা এবং অপারেশন পরবর্তী যত্নের ওপর।
সবশেষে
অনেক ক্ষেত্রে রোগী ব্যথা, মলদ্বারের পাশে ফোলা এবং নিজে থেকে ফেটে গিয়ে পুঁজ বা পানি ঝরা কিংবা বিষফোঁড়ার জন্যে চিকিৎসকের কাছে আসেন। পরবর্তীতে পুঁজ বা পানি পড়লে ব্যথা কমে যায়, রোগী কিছুটা আরাম বোধ করেন এবং কিছুদিনের জন্যে রোগী মোটামুটি ভালো হয়ে যান। এ সময় রোগী ভাবেন যে তিনি ভালো হয়ে গিয়েছেন, ফলে চিকিৎসকের কাছে আসেন না। আবার অনেক রোগী ব্যথার সময় ফার্মেসী থেকে অ্যান্টিবায়োটিক এবং ব্যথার ওষুধ কিনে খান এবং ব্যথা ভালো হলে এ সমস্যার কথা আর মনে থাকে না। এভাবে বছরের পর বছর চলতে থাকলে ব্যপারটি জটিল আকার ধারন করে এবং রোগী জটিলতা নিয়ে আবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
এ রোগটির ভাল চিকিৎসা আছে এবং সঠিক চিকিৎসায় এ রোগ সম্পূর্ণ ভালো হতে পারে। এ রোগের একমাত্র সমাধান সার্জারি বা শৈল্য চিকিৎসা। তাই এ রোগ হলে লজ্জা না পেয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হবে। ফিস্টুলা রোগের জন্য জনসচেতনতার অভাব ও বাল্যবিবাহকে দায়ী করা যেতে পারে। তবে প্রধান কারণ হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী প্রসব বা প্রসবকালীন আঘাতকেই দায়ী করা যায়।

COMMENTS

Name

খাদ্য ও পুষ্টি,36,জন্মনিয়ন্ত্রণ,1,পুরুষের স্বাস্থ্য,4,ভেষজ চিকিৎসা,20,মহিলা স্বাস্থ্য,241,শিশু স্বাস্থ্য,56,সমস্যা ও সমাধান,202,
ltr
item
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি: ফিস্টুলা বা ভগন্দর কি এ রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
ফিস্টুলা বা ভগন্দর কি এ রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
https://i.ytimg.com/vi/ch-aQEN9wRA/hqdefault.jpg
https://i.ytimg.com/vi/ch-aQEN9wRA/default.jpg
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2017/11/symptoms-of-this-disease-and-treatment.html
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2017/11/symptoms-of-this-disease-and-treatment.html
true
3985472120302382524
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy