অহেতুক ভীতি বা ভয় দূর করার সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি

ভয় হচ্ছে হুমকি ও বিপদের প্রতি এক ধরনের আবেগতাড়িত সাড়া। জীবনে কখনোই ভয় পাননি, এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতি...

ভয় হচ্ছে হুমকি ও বিপদের প্রতি এক ধরনের আবেগতাড়িত সাড়া। জীবনে কখনোই ভয় পাননি, এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ভয় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এই ভয়ই যদি স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করে তীব্র আকার ধারণ করে অথবা ভয়টি হয় অহেতুক, তখন তা রোগ হিসেবে পরিগণিত হয়। সাধারণত একে ফোবিয়া বা ফোবিক ডিজঅর্ডার বা অহেতুক ভীতি রোগ বলা হয়।

ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি পরিবেশ-পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় ভীত হয়ে পড়ে। ব্যক্তির অহেতুক ভীতির কারণে তার ব্যক্তিজীবন, শিক্ষাজীবন বা কর্মজীবনে ব্যাঘাত ঘটে। ব্যক্তি বুঝতে পারে যে, তার ভীতিটি অহেতুক বা অতিরিক্ত কিন্তু ভয়টা সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যে বিষয় বা পরিস্থিতি ভয়ের সৃষ্টি করে, ব্যক্তি তা এড়িয়ে চলে অথবা তার মুখোমুখি হলে অতিরিক্ত উদ্বেগের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা দেয়।

ফোবিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি ভীতির উদ্রেককারী বিষয় বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে যেসব শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়, তার মধ্যে রয়েছে-

া বুক ধড়ফড় করা া শ্বাসকষ্ট া দম বন্ধ ভাব

া বুকের মাঝে চাপ অনুভব, ব্যথা া হাত-পা কাঁপা া মুখ শুকিয়ে আসা া মাথা ঝিম ঝিম করা, ঘুরানো বা ব্যথা া ঘুমের সমস্যা া অতিরিক্ত ঘাম হওয়া া ক্লান্তি া শরীর টান টান হয়ে ওঠা া পেটের মাঝে অস্বস্তিবোধ া ডায়রিয়া া বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
ভুক্তভোগী প্রচণ্ড উদ্বেগ ও নিয়ন্ত্রণহীন আতঙ্কে ভুগতে পারে। এ সময় তার এমনও মনে হতে পারে যে, সে বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছে বা মারা যাচ্ছে। কিছু সময় পর এ অবস্থার অবসান ঘটে। উল্লেখ্য যে, যদিও এসব উপসর্গের হঠাৎ আক্রমণে ব্যক্তি অসহ্য কষ্টবোধ করে, একসময় উপসর্গগুলো চলে যায় এবং এ থেকে মৃত্যু বা ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
অহেতুক ভীতির কারণ :

ভীতি মানব মনের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ভীতি কেন জন্মায় মানুষের মনে? এ নিয়ে নানা সময়ে গবেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা নানা গবেষণা করেছেন, বিভিন্ন থিওরি দিয়েছেন। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানী র‌্যাচম্যান ভীতি উদ্রেকের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন-

১. ডাইরেক্ট কন্ডিশনিং : কোনো ব্যক্তি যদি বাস দুর্ঘটনার শিকার হন সেক্ষেত্রে তার মধ্যে বাস সম্পর্কে ভীতি জন্মাতে পারে। এ রকম কোনো বস্তু বা বিষয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিজে ভয় পেলে পরবর্তীতে সেই বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে ভীতি থেকে যেতে পারে। একে ডাইরেক্ট কন্ডিশনিং বলে।

২. ভিকারিয়াস একুইজিশন : ভীতিজনক অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে বা কোনো পরিস্থিতে অন্যকে ভীতিজনক আচরণ করতে দেখে ব্যক্তির মনে ভীতি জন্মাতে পারে। যেমন, মা-কে আরশোলা দেখে ভীতিজনক আচরণ করতে দেখলে শিশুও আরশোলায় ভয় পেতে শেখে।

৩. ইনফরমেশনাল এন্ড ইন্সট্রাকশনাল পাথওয়ে : কোনো বিষয়ে ভীতিজনক তথ্য বা সাবধানী শুনে শুনেও ভীতি জন্মাতে পারে। যেমন, প্রতিনিয়ত পত্রিকায়-টিভিতে বাস দুর্ঘটনার খবর পড়তে-শুনতে থাকলে ব্যক্তি বাসে চড়তে ভয় পেতে পারে। বাবা-মা শিশুকে উঁচু স্থানে চড়ার বিপদ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সাবধান করতে থাকলে শিশুর উঁচু স্থান সম্পর্কে ভীতি জন্মাতে পারে।

স্যালিগম্যানের মতো আরেক দল বিজ্ঞানী বলেন, এই তিনভাবেই যে সব ভয়ের সৃষ্টি হয়- তা নয়। কিছু ভয় আছে, যা পাওয়ার জন্য মানুষ জন্মগতভাবেই তৈরি হয়ে আসে।

প্রকৃত বা স্বাভাবিক ভীতি যেমন জন্ম নেয় উপরোক্ত পদ্ধতিতে, তেমনি অহেতুক ভীতিও জন্মাতে পারে একই পন্থায়। যেমন- অহেতুক ভীতি রোগে আক্রান্ত বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনকে দেখে একই বিষয়ের প্রতি ব্যক্তির অহেতুক ভীতি জন্মাতে পারে বা কোনো বিষয়ে নিয়মিত ভুল তথ্য বা সাবধানবাণী দিয়েও অতিরিক্ত ভীতির সৃষ্টি করা যায়।

মনোবিজ্ঞানীরা অহেতুক ভীতির পেছনে আরো অনেক কারণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এ রোগে বংশগতির প্রভাব রয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এছাড়া শৈশব থেকে শিশুর মানসিক বিকাশে ত্রুটি, অভিভাবকের প্রতিপালনে ও ভালোবাসায় ত্রুটি, বিশৃঙ্খল পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ, সহযোগিতা ও সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশের অভাব, দারিদ্র্য, শৈশবে প্রিয় কারো মৃত্যু রোগ-ঝুঁকি বাড়ায়। রোগীর ব্যক্তিত্বের ত্রুটিপূর্ণ ধরনও রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিভিন্ন প্রকার মনোসামাজিক চাপ, মাদকাসক্তি প্রভৃতির কারণে রোগ-ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির মাঝে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।

বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন ধরনের ভয়ের সূচনা হতে দেখা যায়। জীবজন্তু, রক্ত, ঝড় প্রভৃতির ভয় শুরু হতে দেখা যায় শিশুকাল থেকেই। উচ্চতার ভয় হতে দেখা যায় সাধারণত কৈশোরের প্রারম্ভে আর কৈশোরের শেষ দিক থেকে যৌবনের শুরুর দিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে ভীতির উদ্রেক ঘটে। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের অহেতুক ভীতি রোগে বেশি ভুগতে দেখা যায়।
চিকিৎসা :

স্পেসিফিক ফোবিয়ার চিকিৎসায় ‘সিস্টেমেটিক ডিসেনসিটাইজেশন’ নামের এক ধরনের বিহেভিয়ার থেরাপির ব্যবহার করা হয়। এতে প্রথমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে রিলাক্সেশন বা শিথিলায়ন পদ্ধতি শেখানো হয়। এরপর ব্যক্তির ভীতির বিষয়টিকে কম উদ্বেগ সৃষ্টিকারী থেকে অধিক উদ্বেগ সৃষ্টিকারী- এভাবে পর্যায়ক্রমে ভাগ করা হয়। যেমন, ধরা যাক, কোনো ব্যক্তির কুকুরের প্রতি অহেতুক ও অতিরিক্ত ভীতি রয়েছে। এক্ষেত্রে, ধরি, কুকুর সম্পর্কীয় আলোচনায় তার উদ্বেগ হয়, কিন্তু কুকুর সংক্রান্ত উদ্বেগের মধ্যে এর মাত্রা সবচেয়ে কম। কুকুরের স্থিরচিত্র দেখা হয়তো তার জন্য এরচেয়ে বেশি উদ্বেজনক। তারচেয়ে বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করে কুকুরের সচল চিত্র বা মুভি দেখলে এভাবে বাড়তে বাড়তে কুকুরের ঠিক পাশে তাকে দাঁড় করিয়ে দিলে উদ্বেগ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। কুকুর সংক্রান্ত ভীতিকে এভাবে অল্পমাত্রা থেকে বেশি মাত্রা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ভাগ করে প্রথমে সবচেয়ে কম মাত্রার উদ্বেগের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। এ সময় উদ্বেগ তৈরি হলে রোগীকে আগে থেকে শেখানো রিলাক্সেশন পদ্ধতিতে নিজেকে শিথিলায়ন করতে উৎসাহিত করা হয়। কয়েকবারের চর্চায় রোগী ওই পরিস্থিতির উদ্বেগাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে। এর পর পরবর্তী ধাপের উদ্বেগের পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে গিয়ে আবারো রিলাক্সেশন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এভাবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে কম মাত্রা থেকে বেশি মাত্রার উদ্বেগের পরিস্থিতিতে রিলাক্সেশন করিয়ে ব্যক্তির অহেতুক ও অতিরিক্ত ভীতি দূর করা বা কমিয়ে আনা হয়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্বেগের শারীরিক-মানসিক উপসর্গ কমাতে ওষুধ ব্যবহারেরও প্রয়োজন হতে পারে।

অহেতুক ভীতি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের সমস্যাটা বুঝতে পারলেও অনেক সময় লোকলজ্জায় তা প্রকাশ করে না। ফলে জীবন কাটে যন্ত্রণায়। অনেকের ব্যক্তিজীবন, শিক্ষাক্ষেত্র বা কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাই, এ রোগের লক্ষণ বুঝতে পারলে দেরী না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন।

COMMENTS

Name

খাদ্য ও পুষ্টি,36,জন্মনিয়ন্ত্রণ,1,পুরুষের স্বাস্থ্য,4,ভেষজ চিকিৎসা,20,মহিলা স্বাস্থ্য,241,শিশু স্বাস্থ্য,56,সমস্যা ও সমাধান,202,
ltr
item
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি: অহেতুক ভীতি বা ভয় দূর করার সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি
অহেতুক ভীতি বা ভয় দূর করার সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি
https://i.ytimg.com/vi/61jIb6AempM/hqdefault.jpg
https://i.ytimg.com/vi/61jIb6AempM/default.jpg
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2018/04/simple-medical-method-of-preventing-unnecessary-fear.html
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2018/04/simple-medical-method-of-preventing-unnecessary-fear.html
true
3985472120302382524
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy