বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো যেভাবে বন্ধ করবেন

মাতৃত্বের অন্যতম বিশেষত্ব হলো বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো। জন্মের পর প্রথম প্রায় ছয় মাস শিশুকে শুধুই মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। এরপর ধীর...

মাতৃত্বের অন্যতম বিশেষত্ব হলো বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো। জন্মের পর প্রথম প্রায় ছয় মাস শিশুকে শুধুই মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। এরপর ধীরে ধীরে তার অন্য খাবারের চাহিদা তৈরি হয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পর শিশু আস্তে আস্তে বাইরের খাবার থেকে সব ধরনের পুষ্টি পেতে শুরু করে। এভাবে প্রায় দু’বছর পর্যন্ত শিশু মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবারে অভ্যস্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে শিশুর শরীরের চাহিদামত পুষ্টিগুন বাহিরের খাবার থেকেই যোগান দেয়া সম্ভব হয়। তখন আর মায়ের দুধের প্রয়োজন পড়ে না।।
দুধ পান বন্ধ করার জন্য মা’কে মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, এবং একই সাথে শিশুকেও প্রস্তুত করে নিতে হবে। ছয় মাসের পর থেকে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত বাড়তি খাবারে (Supplementary Food) অভ্যস্থ করতে হবে। এভাবে সে একসময় বুকের দুধ ছাড়াই অন্য খাবার খাওয়া শুরু করবে। বুকের দুধের মাধ্যমে মা-সন্তানের একটি নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। তাই দুধ ছাড়ানো প্রক্রিয়াতে মায়েদের মনে বিষন্নতা তৈরি হয় এবং শিশুও এক ধরনের অসহায়ত্ব বোধ করে। তবে যেটি মাথায় রাখতে হবে, তা হলো মায়ের দুধ ছাড়ানোর এই প্রক্রিয়াটা মা-শিশুর আন্তরিক বন্ধন শেষ করে দেয় না, বরং তা আর দৃঢ় করে।

কখন দুধ ছাড়ানো উচিত?

পাশ্চাত্যের বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশু যতদিন খেতে চায় ততদিন তাকে দেয়া উচিত। যদিও বাচ্চার দু বছর বয়সের পর থেকে তার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টিগুন, সে বাইরের খাবার থেকেই পায়। কোন মা দুই বছরে মায়ের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন সিদ্ধান্ত নেবার পর, দুইজনেরই মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। সেক্ষেত্রে বাচ্চার বয়স দু বছর হবার আগেই মা শিশুকে দুধ পান বন্ধ করানোর প্রস্তুতি নিতে পারেন। বাচ্চার বাড়ন্ত শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুন সরবরাহের জন্য বাইরের খাবার জরুরী।

দুধ ছাড়ানোর প্রক্রিয়া

একটা সময়ে বাচ্চার অন্য খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং ক্রমান্বয়ে খাবারের পরিমান বাড়বে। তখন আপনি এই প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন। প্রথমেই তাড়াহুড়ো করতে যাবেন না। এক্ষেত্রে আপনি সুবিধামতো এইধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।
প্রথমত, দুধ ছাড়ানোর প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে শুরু করুন। এতে আপনার শরীর যেমন বাচ্চার দুধের চাহিদা কমার সংকেত পাবে, তেমনি বাচ্চা দুধের চাইতে বাইরের খাবারে আগ্রহ জন্মানো শুরু করবে। বাচ্চাকে নিজের হাতে খেতে দিন, খাবারে আগ্রহী করে তুলুন।
এভাবে আস্তে আস্তে দুধ খাওয়ানোর পরিমান কমিয়ে দিন। আগে যদি ৬ বার খাওয়াতেন, এখন ২ বার খাওয়ান। যদি কোন কারনে এক বছরের আগে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করতে চান, তাহলে দুধের বদলে ফরমুলা দিয়ে পারেন। আবার বাচ্চার বয়স এক বছর হয়ে গেলে, গরুর দুধ দেয়া শুরু করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, নিজের যত্ন নিন। দুধ খাওয়ানো যখন ধীরে ধীরে কমিয়ে দেবেন, দুধ জমে গিয়ে স্তন ভারী বোধ হতে পারে। সেক্ষেত্রে দুধের জমে যাওয়া এড়াতে ঠান্ডা সেঁক নিতে পারেন। লিকেজ এড়াতে নার্সিং প্যাড ব্যবহার করুন। এতে দুধ বের হয়ে কাপড় নষ্ট হওয়া এড়াতে পারবেন। যারা দুধ পাম্প করে বাচ্চাকে খাওয়ান, আস্তে আস্তে পাম্পিং এর পরিমান এবং সময় কমিয়ে আনুন।
অনেক কাল আগে থেকে বাঁধাকপির পাতা ব্যবহার করে আসছেন মায়েরা দুধ ছাড়ানোর সময় স্তনের অস্বস্তি দূর করতে। এটি এক ধরনের এনজাইম নিঃসরন করে, যা দুধ তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করে। স্তনে ম্যাসাজ করুন, এটি জমে যাওয়া দুধ বের করে দিতে সাহায্য করবে। দুধ জমে দুগ্ধনালী (Milk duct) বন্ধ হয়ে খুব বেশী ব্যাথা হলে চিকিৎসকের শ্মরনাপন্ন হোন।
তৃতীয়ত, বাচ্চার চাহিদার দিকে খেয়াল রাখুন। বাচ্চাকে বেশী বেশী সময় দিন, আদর করুন। বাচ্চার মনোযোগ অন্য দিকে সরাতে তার সাথে বেশী করে খেলুন। যেসব জায়গায় বসে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতেন, সেগুলো থেকে কিছুদিন দূরে থাকুন। বাবা-মা দুইজনই বাচ্চাকে পালা করে সময় দিন। বাচ্চার প্রতি ধৈর্য্যশীল হোন। এটি তার জন্য নতুন একটি অভিজ্ঞতা। তাকে অভ্যস্থ হতে সময় দিন।

দুধ ছাড়াতে কতদিন সময় লাগতে পারে

শিশুকে শক্ত (Solid) খাবারে অভ্যস্ত করে দুধ ছাড়াতে কয়েক সপ্তাহ এমনকি মাসও লেগে যেতে পারে। এক এক বাচ্চার ক্ষেত্রে সময়টা এক এক রকম। শিশুকে যদি মানসিকভাবে প্রস্তুত না করানো যায়, তখন সময়টা দীর্ঘতর হয়। এ মধ্যবর্তী সময়টা বাচ্চা নিজ থেকে বুকের দুধ খেতে না চাইলে খাওয়ানো যাবে না। অনেক বাচ্চা দুধ খাবার সময়টা ভুলেনা এবং কান্নাকাটি করে। তারা চাইলে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। তবে চেষ্টা করা উচিত অন্য খাবার দিয়ে অন্য দিকে মন ঘুরিয়ে নেয়া যায় কিনা।

যদি বাচ্চা বন্ধ করতে না চায় তখন কি করা উচিৎ?

বাচ্চা যদি বুকের দুধ খাওয়ার সময়গুলোতে কান্নাকাটি বেশি করে তবে অন্যভাবে চেষ্টা করা উচিৎ। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো ছাড়াও বেশী বেশী আপনার সান্নিধ্যে রাখুন। কেননা সে এই সময় আপনার সান্নিধ্য বেশী করে পেতে চাইতে। সেক্ষেত্রে দুধ খাওয়ানোর সময়গুলোতে তাকে তার পছন্দের খাবার, ফিঙ্গার ফুডস খেতে দিন। মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার জন্য তাকে বিভিন্ন ধরনের বাচ্চাদের রঙিন বই দেখানো যায়, গান গেয়ে শুনানো যায়, খেলাধুলা করানো যায় । মোটকথা তখন বাচ্চার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারলে, সে দুধ খাওয়ার ব্যাপারটা ভুলে থাকবে। ধৈর্য্য ধরুন, সময় নিন।

মায়েদের জন্য টিপস

প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র বুকের দুধ, এর পর থেকে দুই বছর পর্যন্ত অন্য খাবারের পাশাপাশি বুকের দুধ দিন। অন্য কোন ব্যক্তিগত বা ডাক্তারী কারন ছাড়া এই সময়ের আগে দুধ বন্ধ না করাই ভালো। যে সব বাচ্চারা এই সময় পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খায়, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হয়।
  • কখনোই তাড়াহুড়া করতে যাবেন না। আপনার শরীর এবং বাচ্চার মানসিক অবস্থার পরিবর্তনে সময় দিন।
  • যাদের পরপর দুটি বাচ্চা তাদের জন্য এ ব্যাপারটা তুলনামুলকভাবে সহজ। ছোটটিকে দেখিয়ে বড় বাচ্চাটিকে বোঝানো যায়, এ খাবার এখন তার জন্য। তাকে বলুন- “তুমি খেলে ছোট বেবিটা খেতে পাবেনা।“
  • একটু বড় বাচ্চাদের মানসিক প্রস্তুতির জন্য তাকে বারবার বলতে পারেন- “বড় হয়ে গেলে আর দুধ খাওয়া যায় না। বড়রা সবাই টেবিলে বসে খাবার খায়।“ এই ধরনের কথা গুলো শুনতে শুনতে বাচ্চার মনে মনে প্রস্তুত হয়। এতে তার প্রতিবাদ করা বা কান্নার মাত্রা কমে আসে।
  • অনেক সময় আমাদের দেশে সাধারনত মায়েরা স্তনবৃন্তে তিতা কিছু লাগিয়ে রাখেন, যাতে দুধের স্বাদ বাচ্চার ভালো না লাগে। আবার স্বাভাবিকের চেয়ে আলাদা বোঝাতে স্তনে হলুদ রঙ, বা ময়দা বা লিপস্টিকের মতো রঙ লাগিয়ে রাখেন। এতে বাচ্চা আর আগ্রহী হয় না।
  • দুধ খাওয়ানো বন্ধ করলে সাথে সাথে শরীরের হরমোনের কারনে আপনার মন খারাপ লাগতে পারে, মুড সুইং হতে পারে। এর জন্য প্রস্তুত থাকুন। পুষ্টিকর খাদ্যাভাস বজায় রাখুন।
  • অন্য অভিজ্ঞ মায়েদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।
  • দুধ জমে যাওয়া জনিত কারনে শারীরিক সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না।

যখনই দুধ বন্ধ করুন না কেন, প্রস্তুতি নেয়া শুরু করুন আগে থেকেই। এতে দুজনের জন্যই ব্যাপারটা সহজ হবে। পরিবর্তনের এই সময়টাকে বাবা সহ পরিবারের অন্যদের সহযোগীতা বাঞ্ছনীয়। তবে মনে রাখবেন, প্রতিটি বাচ্চাই অনন্য। একজন মা’ই তার সন্তানকে সবচেয়ে ভাল বুঝবে। তাই মা বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিবে কখন কিভাবে তার বাচ্চার দুধ ছাড়াবেন। বাচ্চার বয়স, স্বাস্থ্য বিবেচনা করে মা উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

COMMENTS

Name

খাদ্য ও পুষ্টি,36,জন্মনিয়ন্ত্রণ,1,পুরুষের স্বাস্থ্য,4,ভেষজ চিকিৎসা,20,মহিলা স্বাস্থ্য,241,শিশু স্বাস্থ্য,56,সমস্যা ও সমাধান,202,
ltr
item
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি: বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো যেভাবে বন্ধ করবেন
বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো যেভাবে বন্ধ করবেন
https://i.ytimg.com/vi/sQ9kmCy5QHE/hqdefault.jpg
https://i.ytimg.com/vi/sQ9kmCy5QHE/default.jpg
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2018/06/blog-post.html
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2018/06/blog-post.html
true
3985472120302382524
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy