বাচ্চা কিছুই খায় না ! কি খাওয়াবেন কি ভাবে খাওয়াবেন, রইলো সমাধান

চেম্বারে বা হাসপাতালে প্রায়ই কিছু প্রশ্ন মায়েরা করে থাকে, স্যার, আমার বাচ্চা কিছুই খায় না! ওকে কি খাওয়াতে পারি? আমার বাচ্চা একদম শুকিয়ে ...

চেম্বারে বা হাসপাতালে প্রায়ই কিছু প্রশ্ন মায়েরা করে থাকে, স্যার, আমার বাচ্চা কিছুই খায় না! ওকে কি খাওয়াতে পারি? আমার বাচ্চা একদম শুকিয়ে যাচ্ছে! স্যার,ওর তো এখন ৬মাস বয়স,ওকে কি সেরিলাক বা পটের দুধ খাওয়ানো যাবে??
শিশুর খাবার নিয়ে কথা বলতে গেলে, আমরা চাইলে শিশুর খাবারকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলতে পারি!!
১. জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত
২. শিশুর ৬ মাস বয়সের পরে
জন্মের ৬মাস পর্যন্ত
এইসময় শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ালেই চলে। তবে এই মায়ের দুধ খাওয়ানোর কিছু নিয়ম অবশ্যই আছে। মা অবশ্যই বসে দুধ খাওয়াবেন। শুয়ে দুধ না খাওয়ানোই ভাল। বসে খাওয়ানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চা যতটা সম্ভব মায়ের কাছাকাছি থাকবে এবং অন্ততপক্ষে ১৫-২০মিনিট যাবত দুধ খাওয়াতে হবে। আর দুধ খাওয়ানোর পর একটু পিঠে মালিশ করে বাচ্চার ঢেকুড় তুলে নিলে ভাল। এতে বাচ্চার পেটে গ্যাস হওয়াটা কম হয়।
কয়েকটা প্রশ্ন মায়েরা এসময় অবশ্যই করে, আমি বাচ্চাকে অন্য কিছু খেতে দিতে পারব কিনা,আমার বাচ্চাতো ঠিকমত মায়ের দুধ পায় না! এই সময় আমি যেটা বলি, মায়ের দুধ ছাড়া শিশুকে একফোঁটা পানি ও খাওয়াবেন না। মাকে বুঝানোর চেষ্টা করি, আপনার বাচ্চা যদি মায়ের দুধ খেয়ে দৈনিক ৬বার প্রস্রাব করে তাহলে বুঝবেন ও ঠিকমত মায়ের দুধ পাচ্ছে।
তবে এই মুহুরতে চাকুরীজীবি মায়েদের নিয়ে আমরা সমস্যার মুখোমুখি হয় বেশি! কারণ তাদের দীর্ঘক্ষন সময় ঘরের বাইরে থাকতে হয়! সেক্ষেত্রেও মায়ের দুধ খাওয়ানোর উপর জোর দিতে বলি। আপনি চাকুরীতে যাবার আগে শিশুকে দুধ খাইয়ে যাবেন, যতটুকু সম্ভব ওর জন্য দুধ রেখে যাবেন। রেখে যাওয়া মায়ের দুধ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৬ঘন্টা পর্যন্ত ভাল থাকতে পারে!! ভাল রাখার জন্য কোনো ফ্রিজ এ রাখা লাগে না বা সিদ্ধ করারও প্রয়োজন নেই। চাকুরি থেকে আসার পর বাচ্চাকে আবার বেশি বেশি করে মায়ের দুধ খাওয়াবেন। তবে বাচ্চাকে দৈনিক ৮-১০ বারের বেশি দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন হয় না। শুধু ঐ সমীকরণটা মনে রাখলেই হবে,
পর্যাপ্ত মায়ের দুধ = দৈনিক ৬বার প্রস্রাব।
হ্যা! যদি দেখেন ৬ বার প্রস্রাব করা স্বত্তেও বাচ্চার ওজন ঠিকমত বাড়ছে না অথবা সারাক্ষন কান্নাকাটি করছে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। তারপরে ও বাচ্চাকে ফরমুলা দুধ ধরিয়ে দিবেন না যদি না বাচ্চাটা আপনার না হয়ে থাকে!!
শিশুর ৬মাস বয়সের পরে
বাচ্চাকে ৬মাস বয়সের পরে মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দিতে হয়, আসলে ৬মাস পর মায়ের দুধ, শিশুর খাদ্যচাহিদা পুরোপুরি পুরণ করতে পারে না, তাই বাড়তি খাবার দেয়া লাগে।বাড়তি খাবার বলতে অনেক মায়েরা ফরমুলা দুধ বা সেরিলাক বুঝে,কিন্তু বাড়তি খাবার বলতে ঘরের খাবারকেই বুঝানো হয়।
অনেকেই সন্দিহান হয়, শিশুকে এইসময় কী খাওয়াবেন! আমরা বাংলাদেশি,তাই বাংলাদেশি মায়েদেরকে শিশুর প্রথম বাড়তি খাবার ভাত আর ডাল দিয়ে শুরু করতে বলি,মায়ের দুধ খাওয়ার সাথে সাথে শিশুকে আরো ৫-৬ বার বাড়তি খাবার খাওয়াতে হবে। ৫-৬ বার খাবারের মধ্যে দিনে ২-৩ বেলা ভাত আর ডাল মিশিয়ে খাবে, সাথে বাকি তিনবেলা কলা বা ডিম বা আলু সিদ্ধ করে করে খাওয়াতে পারেন।
ভাত রান্না করতে চাইলে যেকোনো চাল হতে পারে,ডালের জন্য যেকোনো ডালই হতে পারে। প্রথমে ভাত আর ডাল কচলিয়ে  শিশুকে খেতে দিন,কোনো ভাবেই ব্লেন্ড করে খেতে দিবেন না। মনে রাখবেন ও কিন্তু প্রথমবার শক্তখাবার মুখে নিচ্ছে,তাই সে বুঝতে পারে না খাওয়াগুলো সে মুখের ভিতরে নিয়ে যাবে নাকি বাইরে বের করে নিয়ে আসবে! মাকে বুঝতে হবে খাওয়াটুকু জিহ্বায় লাগাতে পারলেই হলো।
এইভাবে ভাত আর ডাল কচলিয়ে শিশুকে ৫-৭দিন খেতে দিন,৫-৭ দিন পর ও যখন অভ্যস্ত হয়ে যাবে তখন সেই ভাত আর ডালের সাথে মাঝেমাঝে সবজি, মাঝে মাঝে মাছ,মাঝেমাঝে মাংস মিশিয়ে খাওয়াবেন।সবজির মধ্যে সেটি মিষ্টি কুমড়া, আলু, বরবটি যেকোনোটি হতে পারে।আর যখন সে প্রত্যেক খাবারের সাথে পরিচিতি হয়ে যাবে তখন ওকে খিচুড়ি বানিয়ে বাচ্চাকে খেতে দিন। খিচুড়ি বানানোর ২ঘন্টার মধ্যে শিশুকে খাওয়াতে হয়, কখন ও বাসি খিচুড়ি বাচ্চাকে খেতে দেয়া উচিত নয়।
এই খিচুড়ি বানানোর প্রক্রিয়াটি একমাস,দুই মাস, তিনমাস ও লাগতে পারে,এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। খেয়াল রাখতে হবে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বাচ্চার বাড়তি খাওয়া দেয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। খিচুড়ি খাওয়ানোর সাথে শিশুকে আপনি মাঝে মধ্যে আলু সিদ্ধ করে খাওয়াতে পারেন, ডিম সিদ্ধ করে করে খাওয়াতে পারেন, তবে প্রথমে ডিমের কুসুমটা খাওয়াবেন, তারপরে সাদা অংশটা খাবে, কলা খাওয়াতে পারবেন- সিদ্ধ করে বা পাকা কলা দুইভাবেই বাচ্চাকে দিতে পারবেন।
আরেকটু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওকে নুডুলস খাওয়াতে পারেন,- নুডুলস এ পর্যাপ্ত তেল আর ডিম মেশাতে পারবেন তবে অবশ্যই মসলা, ঘরের মসলা হলেই ভাল।
এখন প্রশ্ন আসবে খিচুড়ি কত টুকু খাবে? খিচুড়ি খাবে ঘরের মেহমানদারি করার জন্য আমরা যে মিষ্টিরবাটি ব্যবহার করি, তার অর্ধেকটা ( মানে আধপোয়া), আস্তে আস্তে পরিমাণটা বাড়াতে থাকবেন।
একটি ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে এই সময় শিশুকে পানি খাওয়াতে হবে। পানি অবশ্যই চামচ দিয়ে খাওয়াবেন বা টিউব দিয়েও খাওয়াতে পারেন। কিন্তু কোনো অবস্থায় ফিডার দিয়ে খাওয়াবেন না। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশু যখন গ্লাস ধরতে পারবে তখন সে গ্লাস দিয়ে নিজে নিজেই খেতে পারবে।
ফলমূলের মধ্যে যেকোনো ফলমূলই খাওয়ানো যাবে তবে আমাদের দেশে যা পাওয়া যায়,তাই বাচ্চাকে খেতে দিন। তবে কলা – পেঁপে – আম এই তিনটি ফলের আসলে কোনো জুড়ি নেই। আপেল, কমলা, আংগুর আমি না খাওয়াতেই বলি,কারণ এইসবে প্রায়ই পেট খারাপ হতে দেখি।
এখন পর্যন্ত জানলেন, বাচ্চাকে কি কি খাওয়ানো যাবে? এবার আসি কোন্ কোন্ খাবারগুলো বাচ্চাকে এই সময় একদমই দেয়া উচিত না, সেগুলো হচ্ছে,গরুর দুধ, সুজি,সাগু,বারলি, চালের গুঁড়ো, ফরমুলা দুধ, সেরিলাক, হাঁসের ডিম, সাগর কলা- আপনি মুরগির ডিম বা কোয়েল পাখির ডিম দিতে পারবেন কিন্তু হাসের ডিম দিবেন না,আপনি বাংলা কলা দিতে পারবেন কিন্তু সাগর কলা না দেয়াই উত্তম।
মায়েদের মধ্যে গরুর দুধ খাওয়ানোর জন্য একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে, পায়েস করে, সুজির সাথে মিশিয়ে উনারা মনের মাধুরী মিশিয়ে গরুর দুধ খাওয়াতে পছন্দ করেন,এখন পর্যন্ত খুব কম শিশুই দেখেছি যারা গরুর দুধ খায় আর অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের চেম্বারে আসে না! গরুর দুধ, গরুর বাচ্চার জন্য, দুই বছরের মধ্যে গরুর দুধ দিয়ে শিশুর পেটের ১২ টা বাজাবেন না।
একটা কথায় বলবো সবসময় ঘরের হাঁড়ির খাবারের প্রাধান্য দিবেন বেশি। – যেই আপনি বাইরের খাবারের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন, দেখবেন – শিশুদের নিয়ে আপনাকে দোজখখানায় (ডাক্তারের চেম্বার) আসা লাগছে!!
সবার শেষে কিছু টিপস্ দিতে চাই,
১. বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় কখনো জোর করবেন না।
২. পরিবারের সবাই যখন খেতে বসবেন তখন শিশুকে সবার সাথে বসিয়ে খাওয়াবেন।
৩. টিভি দেখিয়ে, মোবাইলে ভিডিও দেখিয়ে শিশুকে খাওয়াবেন না।
৪. কখনোই একই প্লেটে বা বাটি করে বাচ্চাকে খাওয়াবেন না। তাহলে কয়েকদিন পরই দেখবেন বাচ্চা প্লেট আর গ্লাস দেখেই দৌড়াচ্ছে আর পরিবারের সবাই তার পিছে পিছে দৌড়াচ্ছে!!
৫. সবসময় একই খাবার, একই সময়ে দিবেন না- মনে করেন, আজকে সকালে ওকে একটা কলা খাওয়ালেন, তারপরের দিন সকালে তাকে একটি ডিম সিদ্ধ করে খেতে দিন। দেখবেন ওর মুখের রুচি নষ্ট হচ্ছে না!
শিশুকে খাওয়ানো আসলেই কঠিন ব্যাপার। কিন্তু এই কঠিন ব্যাপারটিকে আমরা আরো কঠিন করে ফেলি যখন শিশুর খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আমরা এক্সপেরিমেন্ট করা শুরু করি! আসলে আমাদের মায়েরা এক একজন মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিনিয়ত তারা সংগ্রাম করেন তাদের শিশুর সুস্বাস্থের জন্য। সবসময় ঘরের খাবারের প্রতি প্রাধান্য দিন, দেখবেন বাচ্চাকে খাওয়ানোটা অনেক সহজ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

COMMENTS

Name

খাদ্য ও পুষ্টি,36,জন্মনিয়ন্ত্রণ,1,পুরুষের স্বাস্থ্য,4,ভেষজ চিকিৎসা,20,মহিলা স্বাস্থ্য,241,শিশু স্বাস্থ্য,56,সমস্যা ও সমাধান,202,
ltr
item
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি: বাচ্চা কিছুই খায় না ! কি খাওয়াবেন কি ভাবে খাওয়াবেন, রইলো সমাধান
বাচ্চা কিছুই খায় না ! কি খাওয়াবেন কি ভাবে খাওয়াবেন, রইলো সমাধান
https://i.ytimg.com/vi/yusM9Lkg480/hqdefault.jpg
https://i.ytimg.com/vi/yusM9Lkg480/default.jpg
বাংলা স্বাস্থ্য বিধি
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2018/08/The-child-does-not-eat-anything-How-to-feed.html
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/
https://www.banglaswasthyobidhi.com/2018/08/The-child-does-not-eat-anything-How-to-feed.html
true
3985472120302382524
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy